উনসত্তরতম অধ্যায় ছিঁড়ে ফেলা
নিজের বাড়ির উপর তলার বারান্দা থেকে সিনগান দেখল, চেংজিউ-র গাড়িটা এখনও রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে, যায়নি, সে গাড়ির ভেতর কী করছে কে জানে। সময়টা বেশ রাত, রাস্তা নিস্তব্ধ, কেউ চলাচল করছে না।
আন্টি উপরে এসে দেখল সিনগান খালি পায়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল, ‘‘সিনগান? কী দেখছো?’’
সিনগান সম্বিত ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি বলল, ‘‘কিছু না, কিছু না।’’ সে পর্দা নামিয়ে দিল, কাচের দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে আন্টিকে জিজ্ঞেস করল, ‘‘আন্টি, আপনি এখনও ঘুমাননি?’’
‘‘মনে হল উপরের দরজা বন্ধ হয়নি, তাই এসে দেখে গেলাম। কিন্তু তুমি, এতো রাতে দাঁড়িয়ে আছো, এখনও ঘুমাওনি? চেংজিউ কি চলে গেছে?’’
সিনগান বলল, ‘‘হ্যাঁ, একটু আগে গেছে, ঘরে একটু গুমোট লাগছিল, তাই বাইরে একটু হাওয়া খেতে গিয়েছিলাম।’’
আন্টি তার অজুহাতে বিশ্বাস করল না, অভ্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘‘চেংজিউ-কে দেখছিলে, তাই তো? ওর গাড়িটা আমিও দেখেছি, এখনও যায়নি।’’
সিনগান খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল, তবে আর কিছু বলল না।
আন্টি আবার অভিজ্ঞ মানুষের মতো বলল, ‘‘ছোট মেয়েরা তো একটু লজ্জা পায়, প্রেমের শুরুতেই তো এরকম হয়, আমি বুঝি।’’
সিনগান আরও বেশি অপ্রস্তুত বোধ করল, তাড়াতাড়ি অজুহাত দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
প্রায় পালিয়ে পালিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল।
...
চেংজিউ ডাক্তারের নিষেধ না মেনে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।
তবে সে চেং পরিবারের বাড়িতে না ফিরে শহরের নিজের ফ্ল্যাটে গেল। সেখানে গিয়ে সিনগান-কে একটা বার্তা পাঠাল, পরের দিন দেখা করার কথা বলল—কিছু কথা আছে।
আসলে আজ রাতে ওকে নিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু সময় হয়ে গেছে, ওরও তো জামাকাপড় নেই, তাই আর বলেনি।
সে জামাকাপড় পরিবর্তন না করেই সোফায় শুয়ে ছাদে তাকিয়ে রইল, ঠোঁটের কোণে হাসি, মনটা ভীষণ ভালো, আজকের চেয়ে খুশির কিছু নেই।
সে একটু অস্বাভাবিক উত্তেজিত, তাই ঘুমোতে পারছিল না, এত রাতে কে জানে ও ঘুমালো কিনা।
ওর বার্তার জবাব আসেনি, চেংজিউ ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল, শেষে ওর মেসেজের উত্তর এল।
ও এক অক্ষরে লিখল, ‘‘ঠিক আছে।’’
চেংজিউ ভাবল, একটা ফোন করেই ফেলল।
...
সিনগান স্নান করে চুল মুছছিল, হঠাৎ ফোনে মেসেজের শব্দ পেল, গিয়ে দেখল চেংজিউ-র পাঠানো বার্তা।
ও দেখা করতে চায়।
এখন ওর কোনো কাজ নেই, এমনকি কাজের দিনেও ওকে অফিসে যেতে হয় না, তাই সহজেই লিখল, ‘‘ঠিক আছে।’’
ও চেংজিউ-র সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করার কথা ভাবেনি।
বিয়ের কাগজ তো উঠে গেছে, তাহলে আর লুকিয়ে কী লাভ, বরং নিজের মনের কথা স্পষ্ট করে দেওয়া ভালো।
আগে ঠিক করা পরিকল্পনা সব এলোমেলো হয়ে গেছে, নতুন করে ভাবতে হবে।
এতদূর এসে তো আর পিছু হটার উপায় নেই, ও চেংজিউ-র সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়ে গেছে, এখন আর কোনো আফসোসের পথ নেই।
ও চেংজিউ-কে সত্যিই পছন্দ করে, সমস্ত সত্তায়, সবটুকু ভালোবাসে।
ভাবনায় ডুবে ছিল, হঠাৎ চেংজিউ সরাসরি ফোন করল।
সিনগান রিসিভ করতেই শুনল, ওর গলা খুব নরম, নাম ধরে ডাকল, ‘‘এখনো ঘুমাওনি?’’
‘‘এখনই চুল শুকাচ্ছি, চুল শুকানোর অপেক্ষা করছি।’’
‘‘এত রাতে চুল ধুয়েছো?’’
ওর লম্বা চুল, রাতে ধুলে শুকাতে দেরি হয়।
সিনগান চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘‘দিনে একটু ঘাম হয়েছিল, না ধুয়ে ঘুমোতে পারি না।’’
‘‘তুমি কুমারী রাশির? পরিচ্ছন্নতাবাতিক?’’ চেংজিউ হেসে বলল।
সিনগান ধরে ফেলল, কিন্তু বুঝল না সে তাকে কুমারী রাশি বলে হাসছে নাকি পরিচ্ছন্নতাবাতিক নিয়ে, অথচ ও কুমারী রাশির নয়, আর মেয়েরা তো এমনিই পরিষ্কার থাকতে ভালোবাসে।
‘‘হ্যাঁ, একটু পরিচ্ছন্নতাবাতিক আছে।’’
চেংজিউ হঠাৎ গম্ভীর হল, ‘‘তাহলে আমাদের দু’জনকে পৃথক বিছানায় ঘুমোতে হবে।’’
‘‘...’’ সিনগান এতটা নির্লজ্জ নয়, থতমত খেয়ে কিছু বলার ভাষা পেল না।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে চেংজিউ আবার বলল, ‘‘আগামীকাল সকাল দশটায় তোমাকে নিতে আসব, কেমন?’’
এখনই ওর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে।
সিনগান বলল, ‘‘দশটা, এত সকালে?’’
‘‘হ্যাঁ, আমার সঙ্গে শপিং মলে যেতে হবে।’’ ওর এখনও চোট সারেনি, মেং চ্যাং তো চায়নি ও এত তাড়াতাড়ি ফিরুক, আরও কিছুদিন বিশ্রাম নিতে বলেছিল, কিন্তু চেংজিউ-র শান্তি নেই, সিনগানকে ঠিকঠাক রেখে তারপরই ফিরবে, বিয়ের অনুষ্ঠানটা পরে হবে।
‘‘ঠিক আছে, তাহলে কাল সকাল দশটায়।’’
‘‘হ্যাঁ।’’
সিনগান হালকা করে জিজ্ঞেস করল, ‘‘আর কিছু?’’
‘‘না, তুমি বিশ্রাম নাও, রাখছি।’’
‘‘শুভরাত্রি।’’ সিনগান অনেক কোমল কণ্ঠে বলল।
চেংজিউ আরও কিছুক্ষণ কথা বলতে চাইলেও ওকে জোর করে জাগাতে চায়নি, তাছাড়া প্রায় বারোটা বাজে, ফোন রেখে দিল, ওকে বিশ্রামে যেতে বলল।
...
রাতটা সিনগান ঠিকমতো ঘুমোতে পারল না, এক ধরনের অজানা উত্তেজনা।
ঘুম না হওয়ায় চোখের নিচে কালি পড়েছে, তাই মেকআপ দিয়ে ঢাকল, সঙ্গে হালকা লিপস্টিক, খুব সাধারণ সাজ, কালো ফিটিং ড্রেস, বেশ শীতল ও খানিকটা প্রলুব্ধকর।
সিনগান সুন্দর করে সেজে নিচে নামল, মা তাকে দেখে স্নেহময় মুখে বলল, ‘‘আজ কোথায় যাচ্ছো?’’
‘‘হ্যাঁ, বাইরে যাচ্ছি।’’
‘‘কার সঙ্গে? বন্ধুদের সঙ্গে শপিং?’’ মা বলল।
সিনগান সন্দেহ করল মা ইচ্ছা করেই জিজ্ঞেস করছে, সে তো গতকালই চেংজিউ-র সঙ্গে বিয়ের কাগজ তুলেছে, আজ বেরোচ্ছে, তাহলে নিশ্চয় চেংজিউ-র সঙ্গেই যাবে।
মা তার উত্তর না শুনেই বলে দিল, ‘‘তাড়াতাড়ি ফিরো, অনেক রাত করে ফেরা চলবে না, ফিরতে দেরি হলে আগে থেকে জানিয়ে দিও, নয়তো তোমার জন্য খাবার হবে না।’’
সিনগান প্রায় লজ্জায় লাল হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
চেংজিউ আগেই পৌঁছে গিয়েছিল, গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছিল।
ওর নেশা অনেক, গলা ভারী হওয়ার এটাতে একটা ভূমিকা আছে।
চেংজিউ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছিল, সিনগান বেরোতেই ওর মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
সিনগান কিছুটা হতবাক, বুঝতে পারল না কী হয়েছে, আবার জিজ্ঞেস করতেও সাহস পেল না, লাজুক গলায় বলল, ‘‘সুপ্রভাত।’’
চেংজিউ চুপচাপ ওর সাজপোশাক দেখে নিল, গম্ভীর গলায় বলল, ‘‘চলো, গাড়িতে ওঠো।’’
কিছুটা অপ্রসন্ন।
সিনগানের মনে হল কিছু একটা খারাপ হয়েছে, ও বোধহয় খুশি নয়?
কেন হঠাৎ মেজাজ খারাপ, বুঝতে পারছিল না।
...
সিন মা আগের দিনের মতো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে দূরের গাড়ি দেখল, স্বাভাবিকভাবেই সিনগান আর চেংজিউ-কে দেখল, ওরা গাড়িতে উঠতেই মা হাসল, পিছনে ঘুরে আন্টিকে বলল, ‘‘আজ রাতে সিনগানের জন্য রান্না করতে হবে না, ও বাড়িতে খাবে না।’’
...
গাড়িতে ওঠার পর পরিবেশ আরও অস্বস্তিকর ছিল।
সিনগান চুপচাপ আঙুল নিয়ে খেলছিল, চেংজিউ-ও কিছু বলল না, সব যেন ওর ভাবনার বাইরে।
শপিং মলে গিয়ে চেংজিউ ট্রলি ঠেলছিল, সিনগান ওর পেছনে হাঁটছিল, হঠাৎ এক শেলফের কাছে থামল, চেংজিউ চারপাশ দেখে বুঝল না ও কোন ব্র্যান্ডের বাথজেল ব্যবহার করে, একটা তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তুমি কোন গন্ধের বাথজেল ব্যবহার করো?’’
সবই তো দৈনন্দিন জিনিসপত্র।
সিনগান বলল, ‘‘যে-কোনোটা হবে।’’
ও খুব সাধারণ ব্যবহার করে, দামও সাধারণ।
চেংজিউ ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘একটা বেছে নাও।’’
সিনগান শেলফ থেকে একটা তুলে ট্রলিতে রাখল।
চেংজিউ হালকা হাসল, ট্রলি ঠেলে এগিয়ে গেল।
সিনগান বুঝতে পারল না, কীসের জন্য এসব করছে, কিছুটা ধন্দে রইল।
গতকালের পরিবেশের সঙ্গে পুরোপুরি আলাদা।
আবারও একই কায়দা, চেংজিউ শ্যাম্পু কিনতেও ওকে জিজ্ঞেস করল।
সিনগান দাঁত চেপে বলল, ‘‘তুমি যেটা পছন্দ করো সেটাই নাও, আমাকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই।’’
বলেই পাশের শেলফে গিয়ে স্ন্যাকস দেখতে লাগল, ভাবল, একটু পরে চেংজিউ-র সঙ্গে শপিং শেষ করে এই স্ন্যাকস নিয়ে কাকা বাড়ি যাবে, কোকোর সঙ্গে খেলবে, সঙ্গে দিদির সঙ্গে কথা বলবে, মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে।
চেংজিউ ওর দিকে তাকিয়ে ওর মেজাজ টের পেল, হালকা হাসল।
শেষে বিল দেয়ার সময়, চেংজিউ ওর কেনা স্ন্যাকসগুলোও একসঙ্গে টাকা দিল, তখন ভিড় ছিল, পেছনের লোকজন ঠেলাঠেলি করছিল, আলাদা বিল দিতে পারল না, পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল।
ব্যাগে জিনিস ঢোকানোর সময় পেছনের একজন হঠাৎ সিনগানকে ধাক্কা দিল, ও হাই হিল পরা ছিল, পা ফসকে সামলাতে না পেরে সামনে পড়ে যাচ্ছিল, সঙ্গে সঙ্গে চেংজিউ-র হাত ধরে ফেলল, চেংজিউ ঝটপট ওর কোমর জড়িয়ে ধরল, বুকে টেনে নিল, ওর আর পড়ে যাওয়া হলো না।
যে তরুণ সিনগানকে ধাক্কা দিয়েছিল, চেংজিউ-র কঠিন দৃষ্টি দেখে বুঝে গেল ওদের সম্পর্ক, তাড়াতাড়ি ক্ষমা চাইল, ‘‘দুঃখিত, ইচ্ছা করে হয়নি, একটু তাড়াহুড়ো করছি বলে...’’
‘‘তাড়াহুড়ো মানে কি লোককে ধাক্কা দেয়া যায়?’’ চেংজিউ-র গলা গম্ভীর, চেহারায় ভয় ধরানো কঠোরতা, সেই তরুণ আর কিছু বলার সাহস পেল না, এক劲 ক্ষমা চাইতে লাগল।
সিনগান কিছু বলল না, চেংজিউ-র বাহু ছেড়ে সোজা হয়ে বলল, ‘‘চলো, অনেক লোক অপেক্ষা করছে।’’
ও ঝামেলা বাড়াতে চায়নি, ঘটনাটা বড় করতে চায়নি, ও পড়ে যায়নি, কিছু হয়নি, তাই চুপচাপ মিটিয়ে ফেলতে চাইল।
চেংজিউ বুঝে গেল, সে খারাপ মানুষ নয়, তবে ছেলেটা ইচ্ছা করেই ধাক্কা দিয়েছিল, সে দেখেছিল, যদি ও না থাকত, হয়তো সিনগান পড়ে গিয়ে আহতই হত।
ক্যাশিয়ারও পরিবেশ শান্ত রাখল, কারণ ঝামেলা হলে শপিং মলের ক্ষতি।
‘‘বলছি, এমন খোলামেলা পোশাক পরে, ইচ্ছা করে ছেলেদের আকৃষ্ট করছো না?’’
লাইনের ভেতর থেকে কেউ মন্তব্য করল, খুব জোরে নয়, কিন্তু আশেপাশে সবাই শুনে ফেলল, সঙ্গে সঙ্গে সিনগানকে ধাক্কা দেয়া সেই তরুণও হাসল, আবারও সিনগানের দিকে তাকাল, যেন কথাটা সত্যি করে দিল।
চেংজিউ ভ্রু কুঁচকে কঠোর সুরে বলল, ‘‘কে বলল? সামনে আসো।’’
সিনগান দেখল চেংজিউ রেগে গেছে, তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, ‘‘কিছু হয়নি, চলো, চলে যাই।’’
ও সত্যিই ঝামেলা চায় না, আর চেংজিউ-র শরীরে এখনও চোট, বড় কাণ্ড হোক চায় না।
কিন্তু চেংজিউ-র এমন প্রশ্নের পর আর কেউ সামনে এল না, ক্যাশিয়ারও বারবার ক্ষমা চাইল।
চেংজিউ দেখল সিনগান কিছু বলতে চায় না, বিরক্তি চেপে ওর হাত ধরে, কড়া চোখে সেই তরুণকে দেখে নিল, চেহারায় স্পষ্ট হুমকি।
ও তরুণও পাল্টা কিছু বলল না, চেংজিউ-র চোখে চোখ পড়তেই আতঙ্কে ঘেমে গেল।
...
পার্কিং লটে গিয়ে চেংজিউ জিনিস গাড়িতে রাখল, চালকের আসনে উঠে একটা সিগারেট ধরল।
সিনগান ধোঁয়ায় দম আটকে কাশল, সঙ্গে সঙ্গে চেংজিউ সিগারেট ফেলে দিল, জানালা নামিয়ে দিল হাওয়া লাগার জন্য।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল।
শেষে চেংজিউ-ই বলল, ‘‘কোথাও লাগেনি তো?’’
সিনগান মাথা নাড়ল, ‘‘না।’’
‘‘তুমি কেমন পোশাক পরবে সেটা তোমার স্বাধীনতা, অন্যদের কথা শোনার দরকার নেই।’’ চেংজিউ এসব বলার সময় ওর দিকে তাকায়নি।
সিনগানের বুক ধক করে উঠল, যেন বুঝতে পারল আজ সকালে ওর অদ্ভুত আচরণের কারণ, সন্দেহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তুমি সকালে আমার সঙ্গে কথা বললে না কেন?’’
চেংজিউ বলল, ‘‘আমি কখন কথা বলিনি?’’
‘‘বলেছো।’’
‘‘...’’ চেংজিউ ওর দিকে ঘুরে তাকাল, দু'জনের চোখাচোখি, ওর চোখের ভাষা বদলে গেল, গলা আরও নরম হয়ে বলল, ‘‘আমি না, আমি কথা না বলিনি।’’
সে আসলে ওর দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছিল না।
বিয়ের কাগজ হাতে পাওয়ার পর ওর মনে যা যা করার ইচ্ছা, সব বেড়ে গেছে, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিল না।
ওর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, সিনগান-এর সামনে আসলে, কিছুই নয়।
সিনগান চোখ নামিয়ে নিজের আঙুলের দিকে তাকালো, কোথাও তাকিয়ে নেই, বলল, ‘‘আমার মনে হয়েছিল তুমি খুশি নও, যদিও কেন বুঝিনি।’’
একজনকে ভালোবাসলে, তার মেজাজ সহজেই টের পাওয়া যায়।
সে সামান্য কিছুতেই বদলে গেলে, চোখ-মুখ, কথা বলার ভঙ্গিতে ধরে ফেলা যায়।
অনেক দূরত্বের সম্পর্কে টিকে না থাকার এটাও একটা কারণ।
প্রথমেই যদি ঠিকভাবে বোঝা না যায়, প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া না দেওয়া যায়, তখন মনে হয়, অপরজন আর আমার কথা ভাবে না, বোঝে না, ঝগড়া শুরু হয়, এবং সেই ঝগড়া সম্পর্কের বারুদের স্তুপ, সামান্যতেই বিস্ফোরণ।
তাদের সম্পর্কেও হয়তো দূরত্ব আসবে কখনো।
হঠাৎ, কেউ ওর থুতনিটা ধরে উপরে তুলল, চোখের সামনে চেংজিউ-র শক্ত, সুন্দর মুখ, এত কাছ থেকে যে ও ওর চোখের পাতা দেখতে পাচ্ছে, এমনকি ওর উষ্ণ, আর্দ্র নিশ্বাসও টের পাচ্ছে।
আর একটু সিগারেটের গন্ধও।
ওর বিরক্তি নেই, বরং মনে হল, সহজেই পড়ে গেছে।
চেংজিউ ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘আমি খুশি না নই, আমি আসলে নিজেকে ধরে রাখছি—তোমার এই ড্রেসটা ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।’’
সিনগান একটু পরে বুঝল কথাটার মানে।
চেংজিউ ওর সুন্দর থুতনিটা একটু নরম করে চেপে ধরল, মনটা ভালো হয়ে গেল, আঙুলের ডগায় ঘষল, নরম গলায় হাসল, ‘‘আমি কীভাবে খুশি না হবো, তুমি আমার স্ত্রী, স্বপ্নেও হাসি ফোটে।’’
সিনগানের কান আবার লাল হয়ে গেল, প্রচণ্ড গরম লাগছিল, ও চেংজিউ-র এই আকস্মিক—মধুর কথার সামনে অসহায়।
ওর আজকের সাজ তো সাধারণই, কিন্তু চেংজিউ-র চোখে যেন খুব প্রলুব্ধকর।
...
সিনগান চেংজিউ-র শহরের ফ্ল্যাটে গেল, যদিও প্রথমবার নয়, ঘরের সাজসজ্জা মনে আছে। ও ঘরে ঢুকে কিচেনে গিয়ে জল খুঁজতে লাগল, খুব তৃষ্ণা পেয়েছিল, মনে হল, গরমের কারণেই এমন।
দু-গ্লাস জল খেয়ে তবেই শান্ত হল।
চেংজিউ এসে পাশে দাঁড়াল, বলল, ‘‘আমার জন্যও এক গ্লাস জল দাও।’’
এই দৃশ্যটা আগের বারের মতোই।
ও ওর পথ আটকাল, সিনগান অসহায়ের মতো বলল, ‘‘আমি আরেকটা গ্লাস নিয়ে আসি, তাতে জল দেবো।’’
‘‘তোমার হাতে তো গ্লাস আছে।’’
‘‘এইটা তো আমি ব্যবহার করেছি।’’
চেংজিউ বলল, ‘‘আমার আপত্তি নেই।’’
চুমু খেতে তো আপত্তি নেই, এসবেই বা কী আপত্তি!
আগেরবার সিনগান জল দিয়েছিল, চেংজিউ নেয়নি, বরং চুমু খেয়েছিল।
এবার সিনগান জল দিল, চেংজিউ গ্লাস নিয়ে এক চুমুকে শেষ করল।
গ্লাসে লিপস্টিকের দাগ রয়ে গেল।
কেউ জানে না, ও দেখেছে কি না।
সিনগান মনে করল, হয়তো দেখেইছে।
দুপুরবেলা চেংজিউ-র মা ফোন করে জানতে চাইল, ও কোথায়, বাড়ি এসে খাচ্ছে না কেন।
সকালে বেরোনোর সময় চেংজিউ-র মা-কে বলেনি, সরাসরি সিনগানকে নিতে গিয়েছিল।
চেংজিউ বারান্দায় গিয়ে মাথা ঠান্ডা করল, বলল, ‘‘আমি ফিরছি না, আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না।’’
‘‘তুমি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছো কয়দিন হয়েছে, সারাক্ষণ বাইরেই থাকো, কালই তো সিনগানের সঙ্গে বিয়ের কাগজ তুলেছো, আবার বেরিয়ে পড়েছো, একটু ওর সঙ্গে সময় কাটাও, ওকে অবহেলা কোরো না।’’
চেংজিউ-র মা ভেবেছিল, ও বোধহয় আবার হো চুয়ানের সঙ্গে খেতে গেছে, তাই অভ্যস্তভাবে বকাবকি করল।
...
সিনগান বসার ঘরের বাথরুমে কেনা জিনিসপত্র সাজাচ্ছিল, শুনতে পেল চেংজিউ কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে, কে বোঝা গেল না, ও কিছু জিজ্ঞেসও করল না, জিনিস রেখে বেরিয়ে এল।
চেংজিউ তখনই এসে বলল, ‘‘এইসব পরে হবে, চলো, বাইরে খেতে যাই।’’
‘‘বাইরে খাবো?’’
‘‘হ্যাঁ, ঘরে রান্না হয়নি, বাসনও নেই, বিকেলে কিনে আনব, দুপুরে বাইরে খেয়ে নিই।’’
...
বলা হয়েছিল, যেভাবে হোক একটা খাওয়া হবে, কিন্তু চেংজিউ অনেক খুঁজে ভালো একটা রেস্তোরাঁ বেছে নিল, খাবার অর্ডার করতেই চেংহুই-র ফোন এল, জানতে চাইল কোথায়, বলল, খাচ্ছি।
চেংহুই সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, আসবে, না হলে ছাড়বে না।
চেংজিউ ওকে আসতে দিতে চায়নি, ফোন রাখতেই চেংহুই বলল, ‘‘তুমি যেতে না দিলে আমি সিন দিদিকে ফোন করব, ওর নম্বর তো আমার কাছে আছে।’’
চেংজিউ রাগে ফেটে পড়ল।
তবু, বছরে কয়বার বা দেখা হয়, ওকে এলেই বা ক্ষতি কী।
সিনগান আপত্তি করল না, খালি একটা খাওয়া তো।
চেংহুই ছুটে এল, সঙ্গে সঙ্গে সিনগানকে জড়িয়ে ধরে, মিথ্যা কান্নার ভান করে বলল, ‘‘আমার দাদা অনেক বছর পর একটা কাজ ঠিক করেছে—সিন দিদিকে বিয়ে করেছে, খুব ভালো হয়েছে, আমাদের ঘর ধন্য।’’
চেংজিউ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, ‘‘তুমি কী রকম কালো হয়ে গেছো?’’
চেংহুই সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঢাকল, ‘‘তুমিই কালো, আমি তো একটু কালো হয়েছি মাত্র।’’
ওর সামরিক প্রশিক্ষণ, এক মাস সূর্যের নিচে ছিল, যতই সানব্লক লাগাক, ঘামেই গলে গেছে, রোদ থেকে বাঁচা যায়নি।
সিনগান ওর মুখ দেখে বলল, ‘‘তোমার প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে?’’
চেংহুই-র গলা এখনও ভাঙা, এক গ্লাস জল খেল, বলল, ‘‘আরে, আরও তিন দিন আছে, এখনও শেষ হয়নি।’’
‘‘এখনও হয়নি?’’
‘‘আমাদের স্কুলে প্রশিক্ষণ খুব বেশি দিন ধরে হয়, একদম সহ্য করা যায় না।’’ চেংহুই নিজের মুখ দেখিয়ে বলল, ‘‘আমার মুখে তিন রকম রং, কপাল সাদা, নাক একটু কম, নিচের মুখ একদম কালো, ভূতের মতো।’’
সিনগান ওর এই আত্ম-বিদ্রূপে হেসে ফেলল, চোখ দুটো চাঁদের মতো বাঁকা।
চেংহুই মুখ ভার করে বলল, ‘‘গলা ভেঙে গেছে, দাদা, আমি তো অফিসারকে বলেছি, গলার অপারেশন হয়েছিল, জোরে চেঁচাতে পারি না, ও শোনেনি, জোর করে চেঁচাতে বলল, সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল, আমি কেঁদে ফেললাম, আর দাদা, তুমি কেন ফিরে এলে না, তুমি এলেই আমাদের অফিসার হতে?''
চেংজিউ বিরক্ত গলায় বলল, ‘‘আমরা তো এক ডিপার্টমেন্টে নই, আর তোমাদের অফিসার তো নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত, ওরাই তোমাদের মজা করায়।’’
চেংজিউ সঙ্গে সঙ্গে ওয়েটারকে ডেকে আরও দু’টা বরফওয়ালা পেয়ারা স্যুপ অর্ডার করল।
‘‘কী মজা! ওরা খুব কঠোর, আমি প্রতিদিন রাতে কাঁদি, সিন দিদি, দেখেচো তো, আমার দাদা একদম পাথরের মতো, ঠান্ডা রক্তের, এখনো ওকে ছেড়ে দিলে সময় আছে।’’
সিনগান হাসল, কিছু বলল না, চায়ের কেটলি থেকে ওর গ্লাসে জল ঢালল।
চেংজিউ ধীরে ধীরে বলল, ‘‘চেংহুই, এখন থেকে বলবে—ভাবিজি।’’
সিনগান এই পরিচয়টা পেয়ে একটু অস্বস্তি বোধ করল, চেংজিউ-র চোখে চোখ পড়তেই সরে গিয়ে গ্লাসে জল খেল।
চেংজিউ-রও মনে হল, গলা শুকিয়ে গেছে, হয়তো গরমের কারণে, সেও গ্লাসে জল খেল।
‘‘ভাবিজি, আমার দাদাকে তোমার কাছে ছেড়ে দিলাম, ও যদি তোমায় কষ্ট দেয়, আমাকে বলো, আমরা সবাই তোমার পাশে।’’
তাদের কাগজ তোলার দিন চেংহুই স্কুলে ছিল, কেউ জানায়নি, সে-ই পরে চেংজিউ-র মাকে ফোন করে অভিযোগ করায় জানতে পারে।
সে খুব খুশি হয়েছিল, ফিসফিস করে বলল, ‘‘দাদা তো বেশ তাড়াতাড়ি কাজটা সেরে ফেলল, আমার তো মনে হয়েছিল বছর শেষে হবে।’’
চেংজিউ-র মা বলল, অমন কথা না বলার জন্য, ভবিষ্যতে সাবধানে থাকবে।
চেংহুই সত্যিই খুশি, সিনগানকে খুব পছন্দ করে, বারবার ওর দিকে তাকায়, আন্তরিক প্রশংসায় বলে, ‘‘ভাবিজি, তোমার ত্বক কী সুন্দর, আমার সঙ্গে তুলনা করলে আমি তো একদম কালো।’’
সিনগান ওকে সান্ত্বনা দিল, ‘‘শীত আসলে আবার ফর্সা হয়ে যাবে, তুমি তো আগে খুব ফর্সা ছিলে, চিন্তা কোরো না।’’