পঞ্চাশতম অধ্যায়: চিকিৎসকের অসুস্থতা
কর্তব্যস্থলে ফিরে এসে, বাইলি উজিকে ও শূ শিমিং একসঙ্গে কিছু আলোচনা করলেন। বাদুং লৌহখনি সব সময়ই রাজ্য প্রশাসনের অধীনে ছিল; এখন রাজ্যের শাসক তো উজিকের পিতাই, ফলে রাজ্য প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া আর কোনো বাধা নয়। এখন কারখানার জায়গার সমস্যা মিটেছে, অর্থেরও অভাব নেই, তার ওপর ঝু ও জিয়াং দু’জন প্রাণপণে এই কাজে যুক্ত হতে চাইছে।
উজিকে শূ শিমিংকে দিয়ে মোটামুটি হিসেব কষালেন। তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘‘শূ শিমিং, আমি দশ হাজার চাঁদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি বাদুং লৌহখনির উৎপাদনমূল্য হিসেব করে মোট বিনিয়োগের একটা অঙ্ক দাঁড় করাও, তারপর ঝু ও জিয়াংয়ের সঙ্গে আলোচনা করো। মোট বিনিয়োগের চল্লিশ ভাগ তাদের জন্য বরাদ্দ রাখো; যে বেশি দেবে, সে পাবে। আমি মনে করি, ওরা দু’জনেই ভালো দাম দেবে। তবে আমার পরামর্শ, দু’জনকেই বিশ ভাগ করে দাও। এই ব্যাপারটা তুমি বুঝে শুনে করো। তবে পরিষ্কার করে দাও, তারা শুধু লাভের ভাগ পাবে, ব্যবসার পরিচালনায় অংশ নিতে পারবে না।’’
শূ শিমিং সম্মতি দিলেন। তিয়েন ঝিচুয়েন এসে জানালেন, চিকিৎসাকেন্দ্রের ঠিকানা ঠিক হয়ে গেছে, নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উজিকে নির্দেশ দিলেন, নির্মাণের প্রয়োজনীয় অর্থ আরেনের কাছে চাইতে, কাউন্টির কোষাগার থেকে নিতে হবে না। একই সঙ্গে আরেনকে পাঠিয়ে লু শিইউন-কে নতুন ঠিকানা দেখতে বললেন, যদি কোনো পরামর্শ থাকে তা জানাতে, যাতে সময়মতো প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা যায়। সঙ্গে উৎসব উপলক্ষে কিছু খাবারও পাঠাতে বললেন।
পরদিন সন্ধ্যায়, শূ শিমিং এসে ঝু ও জিয়াংয়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ফল জানালেন। শূ শিমিং বললেন, ‘‘আপনার অনুমানই ঠিক, ঝু ও জিয়াং দু’জনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়েছে; সবাই-ই চেয়েছে চারভাগের পুরোটা নিজেদের করে নিতে। তারা শেষ পর্যন্ত চারভাগের দাম তিন হাজার চাঁদি পর্যন্ত তুলেছে। আমি মাঝখানে থেকে, আপনার নির্দেশ মতো, তাদের দু’জনকেই বারো হাজার চাঁদি করে দিতে বলেছি, দু’জনই বিশ ভাগ করে নেবে। তবে জিয়াং রাজি হয়নি; সে বলেছে, এই বিশ বিঘা জমি তো সে দিয়েছে, ঝু-র চেয়ে কম পাবে কেন? সে ঝু-কে পাঁচশো চাঁদি বেশি দিতে বাধ্য করেছে, ফলে শেষ পর্যন্ত ঝু দিয়েছে বারো হাজার পাঁচশো চাঁদি।’’
শূ শিমিং চুক্তিপত্র এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘এই চুক্তিপত্র দু’জনের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছে, আপনি দয়া করে সিল দিন।’’
বাইলি উজিকে চুক্তিপত্র হাতে নিয়ে বললেন, ‘‘চমৎকার কাজ হয়েছে, আপনি কষ্ট করেছেন। এখন কারখানার নির্মাণ-সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোও আপনাকেই দেখতে হবে। আর বারুদ প্রস্তুতকারক আর লৌহশিল্পীদের নিয়োগের কাজ কেমন চলছে?’’
শূ শিমিং জানালেন, ‘‘আমাদের এলাকার কারিগরদের একত্রিত করার দায়িত্ব তিয়েন ঝিচুয়েন নিয়েছেন। চিঠি নিয়ে ও কারিগরদের আনতে কাউকে পাঠানোর মতো লোক পাওয়া যাচ্ছিল না, শাসকের লোকদেরও পাঠাতে মন চাইছিল না; ভালোই হয়েছে, ওয়েই নামের একজন স্বেচ্ছায় যেতে চেয়েছে, তাকেই পাঠানো হয়েছে।’’
বাইলি উজিকে মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘ওয়েইয়ের ওপর আমার ভরসা আছে, তবে সে তো একেবারে বইপড়া লোক, শরীরটা ভেঙেই না পড়ে!’’
নববর্ষের উৎসবে, উজিকে ও অন্যরা দিনের বেশির ভাগ সময় কাটাচ্ছিলেন সেনাশিবিরে। কালো পতাকার বাহিনীর সব সৈনিকই শিবিরে কঠোর অনুশীলনে ব্যস্ত। উজিকে কোনো কার্পণ্য করেননি, প্রতিদিন সৈনিকদের গোশত ও উন্নত শস্যের খাবার দিচ্ছেন। দশদিনের মধ্যে সবাই বেশ জমে উঠেছে, শরীরেও জোর এসেছে, পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কও গাঢ় হয়েছে। সৈনিকেরা এই কমান্ডারের কথা মনে রেখেছে, যিনি তাদের সঙ্গে একই হাঁড়িতে ভাত ভাগ করে খান।
এইদিন, চৈত্রের চতুর্দশী। আগামীকালই ফানুস উৎসব।
উজিকে ও আরেন ছয়জন নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে সারাবাড়ি শোভিত করলেন রেশমি ফুল আর লণ্ঠন দিয়ে। সারাদিন পরিশ্রম করে, শেষে মূল ফটকের বামে টাঙালেন দুটি বড় লাল লণ্ঠন। কাজ শেষে উজিকে শূ শিমিংকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘শূ, বাদুং নগরে আগে ফানুস উৎসব হতো?’’
শূ শিমিং বললেন, ‘‘হ্যাঁ, উৎসবের রাতে প্রতিটি বাড়িতে লণ্ঠন টাঙানো হয়। শহরের বড়লোকরা তো আরও উৎসাহে এগিয়ে আসে—লণ্ঠন প্রতিযোগিতাও হয়। বেশ জমজমাট, আপনি চাইলে ঘুরে দেখতে পারেন।’’
তাঁর তীক্ষ্ণ চাহনি চকচক করল, মনে হলো কী যেন ভাবছেন। বাইলি উজিকে মনে মনে বিরক্ত হলেও, আরেনকে নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রের দিকে রওনা দিলেন। উৎসব, তাই চিকিৎসাকেন্দ্রও বন্ধ। উজিকে বহুবার দরজায় কড়া নাড়ার পর ছোটো ছুঁই এসে দরজা খুলল।
‘‘ছুঁই, শিইউন কোথায়?’’
‘‘আমার ছোটোবউমা অসুস্থ।’’ ছুঁই চোখ ঘুরিয়ে বলল, যেন বলছে, অবশেষে মনে পড়ল দেখতে এসেছেন?
উজিকে শুনেই সত্যিই চিন্তিত হলেন; বছরের এই সময় অসুস্থ হওয়া ভালো লক্ষণ নয়। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘ডাক্তার ডাকোনি কেন...’’ হ্যাঁ, এরা নিজেরাই তো চিকিৎসক, উপরন্তু সিদ্ধহস্ত।
উজিকে দৌড়ে পেছনের ঘরের দরজায় চলে গেলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, এ তো কারো ব্যক্তিগত কক্ষ, অযথা প্রবেশ ঠিক নয়।
এ সময় ভেতর থেকে লু শিইউনের কণ্ঠ ভেসে এল, ‘‘কে, উজিকে এসেছে? ছুঁই, ওকে ভেতরে আসতে দাও।’’
উজিকে ছুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, ‘‘দেখো, যার নিজের অনুমতি আছে, তুমি আর কী করবে?’’ ছুঁই চোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘‘যান, ভেতরে যান।’’
উজিকে কিছু মনে না করে, আরেনকে বাইরে ছুঁইয়ের সঙ্গে থাকার বললেন, নিজে পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।
লু শিইউন আধশোয়া হয়ে বিছানায় বসেছিলেন, মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট, তবে দেখলে বোঝা যায় বেশ ভালো আছেন।
‘‘বসুন।’’ লু শিইউন ইঙ্গিত করলেন।
উজিকে বিনয় না করে বসে বললেন, ‘‘তুমি কী অসুখে পড়েছ?’’
‘‘কিছু না, সামান্য ঠান্ডা লেগেছিল, কয়েকদিন হয়ে গেছে, সেরে উঠছি। চিন্তা করোনা।’’
‘‘সব দোষ আমার, আগে আসা উচিত ছিল, শুধু শিবিরেই সময় কাটালাম।’’
‘‘এমন কথা বলো না। তুমি আগে এলেও কিছু করতে পারতে না।’’
‘‘তা বলা যায় না, হয়তো আগে এলে তোমার অসুখই হতো না! উজিকে সত্যিই দোষী।’’
লু শিইউন হাসতে বাধা রইলেন না, উজিকে মনে মনে ভাবলেন, এ মেয়েটি বড় দুর্বল, হাসি চাপতে পারে না।
একটু হাসার পর, লু শিইউন উজিকের দিকে তাকিয়ে, তার আন্তরিকতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন, ‘‘ধন্যবাদ।’’
মুখ গম্ভীর করে লু শিইউন জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘উজিকে, কী কারণে এসেছিলে?’’
উজিকে বললেন, ‘‘আসলে ইচ্ছা ছিল আগামীকাল তোমার সঙ্গে শহর ঘুরে লণ্ঠন দেখতে যাওয়ার। কিন্তু তুমি যেহেতু অসুস্থ, পরে দেখা যাবে।’’
লু শিইউন মৃদু স্বরে বললেন, ‘‘যদি কাল একটু ভালো থাকি, তাহলে তোমার সঙ্গে যেতে পারি।’’
উজিকে তাড়াতাড়ি বাধা দিলেন, ‘‘না, সময় plenty, প্রতি বছরই তো লণ্ঠন দেখা যায়, শরীরটাই আসল। শুধু লণ্ঠনের জন্য আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে, নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।’’
লু শিইউন আবার মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘‘ধন্যবাদ।’’
উজিকে বললেন, ‘‘ঠিক আছে, চিকিৎসাকেন্দ্রে কিছু লাগবে? আমি পাঠিয়ে দেব।’’
লু শিইউন মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘‘এখন এখানে শুধু আমি আর ছুঁই, বাকিরা বাড়ি চলে গেছে, কিছু লাগবে না, তুমি চিন্তা করো না।’’
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। কিছুক্ষণ পরে, লু শিইউন বললেন, ‘‘উজিকে, যদি কোনো সরকারি কাজ থাকে, চলে যাও, আমি ঠিক আছি।’’
উজিকে দ্রুত বললেন, ‘‘শিইউন, আমাকে তাড়াবে না, আজ তো চৈত্রের চতুর্দশী, কোনো কাজ নেই, তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্যই এসেছি।’’
উজিকে একটু ভেবে বললেন, ‘‘শিইউন, চলো, তোমাকে একটা হাস্যকৌতুক বলি। তুমি হাসবে, তাতে শরীরও ভালো হবে।’’
‘‘হাস্যকৌতুক?’’
‘‘হ্যাঁ।’’
‘‘ও, বলো, আমি মন দিয়ে শুনব।’’
উজিকে গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন, ‘‘তাং যুয়াওজং-এর সময়, চাংআন শহরের রাস্তায় এক বৃদ্ধ দম্পতি হাঁটছিলেন। হঠাৎ দু’জনে মাটিতে পড়ে থাকা এক মুদ্রা দেখতে পেলেন, কুড়োতে যাবেন, এমন সময় আরেকজন আগে গিয়ে তুলে নিল। কিন্তু সে লোক হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘কোন গাঁয়ের গরীব লোক এত সুন্দর গোল ফিদা ফেলেছে?’’’
লু শিইউন হেসে কাৎ, মুখ চাপা দিতে বাধ্য হলেন, হাসি লুকাতে পারলেন না।
উজিকে আবার বললেন, ‘‘রাস্তায় সবাই হাসছিল, তবে ওই বৃদ্ধ দম্পতির স্বামী এত হাসছিলেন যে সামনে-পেছনে দুলছিলেন। স্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এত হাসছো কেন? এত হাসার কী আছে?’ বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, ‘হা হা... আমি তো ভাবতাম শুধু আমার সঙ্গেই এমন হয়!’’’